রাজ্জাক যখন ‘এক্সট্রা’, সম্মানী ২০ টাকা!

সিনেমা জগতে ‘এক্সট্রা’ বলতে একটা শব্দ আছে। কেন্দ্রীয় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের পাশাপাশি নগণ্য কোনো চরিত্রে কাজ করেন এসব শিল্পী। তাঁদের নিয়ে একটা প্রচলিত কথা আছে—একবার গায়ে ‘এক্সট্রা’ তকমা লাগলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। দু-একটি ব্যতিক্রম উদাহরণ আছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক্সট্রা থেকে এক নম্বর নায়ক হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ নায়করাজ রাজ্জাক।

সিনেমা জগতে ‘এক্সট্রা’ বলতে একটা শব্দ আছে। কেন্দ্রীয় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের পাশাপাশি নগণ্য কোনো চরিত্রে কাজ করেন এসব শিল্পী। তাঁদের নিয়ে একটা প্রচলিত কথা আছে—একবার গায়ে ‘এক্সট্রা’ তকমা লাগলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। দু-একটি ব্যতিক্রম উদাহরণ আছে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক্সট্রা থেকে এক নম্বর নায়ক হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ নায়করাজ রাজ্জাক।

রাজ্জাকের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং জীবনী পড়লে একটা কথা স্পষ্ট হয়, মানুষটা শুধু পর্দায় কাজ করার জন্যই জন্মেছেন। এক জীবনে তিনি অভিনেতাই হয়েছেন। অন্য আর কিছু নয়। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া তেমন করেননি। ব্যবসা, চাকরি—কোথাও থিতু হননি। এর একটাই কারণ—নায়ক হতে চেয়েছিলেন রাজ্জাক।

স্কুলজীবনে টুকটাক মঞ্চে কাজ করেছেন। কলেজে পড়ার সময় চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান। অজিত ব্যানার্জির ১৯৫৮ সালের ছবি ‘রতন লাল বাঙালি’। ওই ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আশিস কুমার ও নায়িকা সন্ধ্যা রায়। ছোট্ট একটি চরিত্র ছিল রাজ্জাকের—পকেটমার।

অবশ্য ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল বেশ কয়েক বছর পর। রাজ্জাকের দ্বিতীয় ছবি ‘পঙ্ক তিলক’। পরিচালনা করেছেন মঙ্গল চক্রবর্তী। ওই ছবিতে ছাত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেন। একজন ছাত্র হিসেবে ক্লাসে আসা-যাওয়া, দু-একটা সংলাপ—এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল রাজ্জাকের অভিনয়। এই দুটি ছবিতে অভিনয় করে রাজ্জাক সম্মানী হিসেব কত পেয়েছিলেন, সে তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো সাক্ষাৎকারে তা উল্লেখ করেননি।

রাজ্জাকের তৃতীয় ছবি ‘শিলালিপি’। এখানেও তাঁর চরিত্রটি ছিল সে অর্থে নগণ্য। একটি গানের দৃশ্যে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেব অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য এবার সম্মানী পেয়েছেন। ২০ টাকা। আগের দুটি ছবিতে ‘এক্সট্রা’র ভূমিকায় অভিনয় করে আদৌ কোনো পারিশ্রমিক বা সম্মানী পেয়েছিলেন কি না, জানা যায় না। এমন সামান্য চরিত্রের জন্য পেশাদার অভিনেতাদের বাইরে যাঁরা অভিনয় করতেন, তাঁদের টাকা দেওয়ার চল তেমন ছিল না। অনেকে মনে করেন, অভিনয়ের জন্য রাজ্জাকের প্রথম সম্মানী এই ২০ টাকাই। অবশ্য ওই সময়ের জন্য অঙ্কটা খুব যে ছোট ছিল, তা কিন্তু বলা যাবে না।

২০ টাকার সম্মানী রাজ্জাকের আস্থা আর উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য তিনি বুঝেছিলেন, টালিগঞ্জে (পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্রশিল্পের মূল কেন্দ্র) সুবিধা করতে পারবেন না। ‘এক্সট্রা’ হয়েই থাকতে হবে। নিলেন নতুন চ্যালেঞ্জ। চলে গেলেন মুম্বাই (তখনকার বোম্বে)।

সময়টা ১৯৫৯ সালে। কলকাতার ছেলে রাজ্জাক মুম্বাই এসেছেন অভিনয় শিখতে। নায়ক হতে চান। সেখানে গিয়ে ভর্তি হন অভিনয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ফিল্মালয়’-এ। তখন ওখানে ক্লাস নিতেন দিলীপ কুমার, শশধর মুখার্জিরা। ওখানে এক বছরের কোর্স। কিন্তু রাজ্জাক বরাবরই অস্থির ছিলেন। তাত্ত্বিক, পদ্ধতিগত শিক্ষা রাজ্জাকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়। বোম্বের চিত্রজগতে ঢোকার সুযোগ খুঁজতে থাকেন, কিন্তু বিষয়টি কঠিন নয়, অসম্ভবই ছিল। কলকাতায় ফিরে আসেন রাজ্জাক।

বিয়ে করে কিছুটা থিতু হন। কিন্তু এর মধ্যে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা থেকে দলে দলে মুসলিমরা পাড়ি দেয় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। রাজ্জাকও স্ত্রী লক্ষ্মী ও শিশুপুত্র বাপ্পাকে নিয়ে ওই দাঙ্গার সময় ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল রাজ্জাক ঢাকা পৌঁছান। নায়ক হওয়ার বাসনা নিয়ে ঘুরে বেড়ান ছবিপাড়ায়।

ঢাকায় এসে প্রথমে কিছুদিন পরিচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। অবশ্যই মনের বিরুদ্ধে। পেটের ভাত তো জোগাতে হবে আগে। তবে তাই বলে নিজের স্বপ্নটাকে বিসর্জন দেননি। নায়ক তিনি হবেনই।

পর্দার সামনে থাকার একটা সুযোগ এল। সেটা ১৯৬৫ সালে, ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ঢাকার ছবিতে ওটিই রাজ্জাকের প্রথম অভিনয়। এরপর আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন। যেমন ‘কার বউ’ ছবিতে অটোরিকশাচালক (বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার), ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ পাড়ার ছেলে মিন্টু, ‘ডাকবাবু’তে আদালতের কর্মচারী, ‘কাগজের নৌকা’য় বাইজিবাড়ির মাতাল।

শুধু পায়ের নিচে মাটি খোঁজার জন্য, বিন্দু বিন্দু জল দিয়ে হলেও নিজের স্বপ্নের চারাগাছটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জীবনযুদ্ধের ওই সময় পরিচয় ঘটে জহির রায়হানের সঙ্গে। তিনি রাজ্জাককে ‘বেহুলা’ ছবিতে নেন। ওই ছবি সাইনিং মানি হিসেবে ৫০০ টাকা নগদ পেয়েছিলেন। সেই টাকার কিছু অংশ সংসারের কাজে খরচ হয়। বাকি টাকা বন্ধু-বান্ধবকে মিষ্টি খাইয়ে শেষ করেন রাজ্জাক।

ছবিটি তখন দারুণ ব্যবসাসফল হয়েছিল। সেই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের দর্শক সানন্দে গ্রহণ করে নেয় রাজ্জাককে। ‘বেহুলা’ ছবিটি করার পর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাক। এক্সট্রার ভূমিকায়, আউট অব ফোকাসে অখ্যাত-অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করেও একসময় হিরো হয়ে ওঠা যায়! রাজ্জাক প্রমাণ করে দিয়েছিলেন।

নায়ক থেকে হয়েছেন মহানায়ক। শুধু একটা কারণে—জীবনে যত ঝড়ঝাপটা আসুক, নিজের স্বপ্নটাকে হারিয়ে যেতে দেননি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *